Thursday, May 13, 2021

 

নারী অধিকার আন্দোলনের স্মরণে প্রতিবছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়। মূলত নারীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি কোনো বৈষম্য না দেখিয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের সর্বস্তরে নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নারী দিবসের সূচনা করা হয়েছিল। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানার নারী শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমেছিলেন। পুলিশ সেই মিছিলে ছত্রভঙ্গের জন্য নিষ্ঠুরভাবে মহিলাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল।
তারপর প্রায় ৫০ বছর পর ১৯০৮ সালে আবারও নারী নির্যাতন এবং বৈষম্য পরিবর্তনের মতো সমালোচনামূলক বিতর্কটির জন্য নারীদের প্রচারাভিযান শুরু হয়। পরবর্তীকালে ১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কে থেরেসা মালিকেলের প্রস্তাবে ‘সোশ্যালিস্ট পার্টি অব আমেরিকা’ দ্বারা সংগঠিত ‘জাতীয় নারীবাদী দিবস’ নামে পরিচিত প্রথম নারী দিবস পালন করা হয়। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে জার্মানি সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন প্রতিবছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয়, ১৯১১ সাল থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। যদিও ১৯১১ সাল থেকে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা ৮ মার্চ দিনটিকেই নারী দিবস হিসেবে পালন করা শুরু করেন। কিন্তু আমেরিকানরা ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ রবিবার জাতীয় নারী দিবস পালন অব্যাহত রাখে। ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের স্বীকৃতি দেওয়ার আগ পর্যন্ত এই দিনটি মূলত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং কমিউনিস্ট দেশগুলো শুধু পালন করত; যদিও বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী দিবস পালন করা শুরু হয়েছে ১৯৮৪ সাল থেকে।
পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান। গত ৫০ বছরে নারীর ভূমিকার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে সঙ্গে এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও পুরুষের সঙ্গে সঙ্গে নারীরা সব সেক্টরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন, বাংলাদেশের নারীরাও তা থেকে পিছিয়ে নেই। গতানুগতিক পেশা যেমন ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ওকালতি, সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা, ব্যাংক-বিমা, ব্যবসা ও সেনাবাহিনী—ইত্যাদির সঙ্গে রিকশা চালানো থেকে শুরু করে বিমান চালনায় পুরুষের পাশাপাশি বাংলাদেশেও নারীরা সমানভাবে এগিয়ে যেতে শুরু করেছেন। তবু নারী-পুরুষ বৈষম্য পৃথিবীর সর্বত্রই খুব প্রকটভাবে বিরাজমান এবং বাংলাদেশে এই বৈষম্য যেন বেড়েই চলেছে।
প্রত্যেক মানুষই যাঁর মাধ্যমে এই পৃথিবীতে আসেন, তিনি হচ্ছেন একজন নারী। এই নারী কখনো স্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে যত্নের সঙ্গে তাঁদের ভালোবাসার সংসার আগলে রাখেন, স্বামীর সন্তান নিজের মধ্যে ধারণ করেন, মায়ের ভূমিকা নিয়ে সন্তানকে জন্ম দেন এবং লালন-পালন করেন, আবার এই নারীই কন্যার ভূমিকা নিয়ে বৃদ্ধ বাবার সেবাযত্ন করেন। এই পৃথিবীতে যেখানে নারীর ভূমিকা এত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে নারীর জন্য শুধু একটা দিন উৎসর্গ করা হবে কেন? আমার মনে হয় নারী দিবসের কথা বলে এখানেও পুরুষের সঙ্গে নারীর বৈষম্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। বছরের ৩৬৪ দিন কি পুরুষের আর মাত্র একটি দিন নারীর? নারীদের উৎসর্গ করার জন্য কেবল এক দিন নয়, বরং নারীদের জন্য দৈনন্দিন উৎসর্গ করা উচিত।
দুঃখজনক হলেও এটা সত্যি, এই একবিংশ শতাব্দীতেও বেশির ভাগ নারী তাঁদের পূর্ণ মর্যাদা পান না, সেটা ঘরে এবং কাজে—উভয় পরিবেশে। তিন দশক আগেও বাংলাদেশে কজন মেয়ে কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পর্যন্ত পৌঁছতে পারত? কজন মেয়ে শিক্ষকতা বা ডাক্তারি-নার্সিংয়ের গতানুগতিক পেশার বাইরে কোনো চাকরি করার কথা ভাবতে পারত? অথচ তিন দশক আগেও মেয়েরা বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পেরেছে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটা সত্যি যে এই তিন দশকে আমাদের দেশ যেখানে শিক্ষায় এবং অর্থনৈতিকভাবে এত এগিয়ে গেছে, সেখানে নারী নির্যাতনের মাত্রা অনেক বেশি বেড়েছে বৈ কমেনি। প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই দেখা যাচ্ছে নারী হত্যা আর ধর্ষণের খবর, তার সঙ্গে আছে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির খবর। অর্থনীতিতে নারীর অবদান বেড়েই চলেছে, কিন্তু কজন নারীর তাঁদের নিজের উপার্জিত অর্থের ওপর স্বাধীনতা আছে?
২৫ বছর ধরে দেশের রাজনীতিতে নারীর রাজত্ব চলছে, নারী যেমন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন, তেমনি করছেন বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব। যেটা পাশ্চাত্যের অনেক দেশেই বিরল, অথচ এমন এক দেশে খুব কম নারীই কাজ থেকে রাতে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ঘরে ফিরতে পারেন! রূপা খাতুনের মতো নাম না জানা অনেককেই কাজ থেকে ফেরার পথে হতে হয় ধর্ষণ এবং হত্যার শিকার; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গার খোলা মাঠে দিনের বেলায় জনসমক্ষে হায়েনাদের হাতে তরুণীদের হতে হয় যৌন হয়রানির শিকার। যৌতুক না দেওয়ার অপরাধে (?) অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নাজমা আক্তারের মতো অনেককেই জীবন্ত অবস্থায় জ্বালিয়ে হত্যা করা হয়। অধ্যাপক রুমানা মনজুরের মতো উচ্চশিক্ষিত নারীকেও স্বামীর নির্যাতনে দৃষ্টিশক্তি হারাতে হয়। বছরে শুধু এক দিন নারী দিবস পালন করে কি আমরা নারী নির্যাতন কমাতে পেরেছি, না বৈষম্য দূর করতে পেরেছি?
বাড়িতে চার ভাইয়ার পর আমার জন্ম হয়েছিল। মেয়ে বলে আমি কখনোই ভাইয়াদের তুলনায় কোনো সুযোগ-সুবিধে কম পাইনি। বাড়িতে একমাত্র মেয়ে বলে বরং একটু বেশিই সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি। আমি যখন মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী, বিয়ের প্রস্তাব আসা শুরু করেছে (তখনকার দিনে বাংলাদেশে সেটাই প্রচলিত ধারা ছিল)। কিন্তু আমার বাবার এক কথা, মেয়ের পড়াশোনা শেষ না করে এবং মেয়েকে আত্মনির্ভরশীল না করে তিনি বিয়ে দেবেন না। আমি যখন চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী, তখন আমার বাবা মারা গেলেন। আমি তাঁর ইচ্ছেমতো পড়াশোনা শেষ করে আত্মনির্ভরশীল হয়েই বিয়ে করেছিলাম। বিয়ের আগে যেমন পাঁচ পুরুষের (বাবা এবং চার ভাইয়া) সঙ্গে বসবাস করেছি। এখনো তেমনি তিন পুরুষের (জীবনসঙ্গী ও দুই পুত্র) সঙ্গে বাস করছি। কিন্তু ছেলে-মেয়ের বৈষম্যটা কখনোই তেমন করে অনুভব করিনি। ২০১৫ সালের পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের ওপর হামলার খবরটা সংবাদপত্রে পড়ে খুব ডিস্টার্ব ছিলাম। দেশে ফোন করে যেসব নিকটাত্মীয়দের কলেজ-ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে আছে, তাদের খোঁজ নিলাম যে তারা ঠিক আছে কি না। সেদিনই রাতে খাবার টেবিলে ঘটনাটি আমার ঘরের মানুষের সঙ্গে শেয়ার করে বলেছিলাম, ‘নিজের কোনো বোন ছিল না বলে আমার মেয়ে সন্তানের প্রতি বরাবরই খুব দুর্বলতা ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, মেয়ে না হয়ে ছেলে হওয়ায় ভালোই হয়েছে।’ আমার কথা শুনে সে আমার দিকে কিছুটা বিরক্তির চাহনি দিয়ে বলেছিল, ‘স্বার্থপরের মতো কথা বলছ কেন? আমাদের মেয়ে না হওয়াতে তো সমস্যার কোনো সমাধান হলো না! এসব সমস্যার প্রধান কারণ হচ্ছে অশিক্ষা, কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামি। সেগুলো কাটিয়ে মেয়েদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হলে সমস্যা থেকেই যাবে, আর সে জন্য তো মেয়েদের ঘরে বসিয়ে রাখা যাবে না?’ সেদিন মানুষটার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও এক ধাপ বেড়ে গিয়েছিল। প্রায় প্রত্যেক মেয়েই তার বাবার কাছে প্রিন্সেস হয়ে থাকে, আমিও ছিলাম এবং আমি সেই সৌভাগ্যবানদের মধ্যে একজন যে কিনা বিয়ের পরে নিজের ঘরের মানুষ আর পুত্রদের কাছেও প্রিন্সেস হয়েই আছি।
ভেবেছিলাম নারী দিবসের ওপর কিছু লিখব, লিখতে বসে অনেকটাই নিজের কথা লিখে ফেললাম। কারণ, আমিও যে একজন নারী। তবে নারী পরিচয়ের আগে আমার পরিচয় আমি একজন মানুষ, আর একজন মানুষ হিসেবে আমি বিশ্বের সবার কাছে শুধু একটা দিন চাই না, আমি চাই বছরের সবগুলো দিনই আমাকে/আমাদের সবাই নারী হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জানাক—সেটা বাড়িতে, সমাজে এবং কাজে—যেখানেই হোক না কেন। এবং সেটা তখনই সম্ভব হবে যখন পুরুষেরা শুধু শিক্ষিত নন, সুশিক্ষিত হবেন।
তবু যাঁরা এত কষ্টের পরও বিভিন্ন সময়ে মা, কন্যা, জায়া, প্রেমিকা ও বন্ধুর ভূমিকা নিয়ে হৃদয় উজাড় করে অন্যদের মাঝে নিজেদের ভালোবাসা বিলিয়ে যাচ্ছেন, এমন একটা বিশেষ দিনে সেই সব নারীর প্রতি রইল আমার সালাম আর অনেক ভালোবাসা।
ডেভিস (ক্যালিফোর্নিয়া) থেকে

0 Comments

Leave a Comment

This is a Sidebar position. Add your widgets in this position using Default Sidebar or a custom sidebar.
error: Content is protected !!